Thursday, February 14, 2013

আমরা কি আসলেই ভালোবাসা চিনি?

ভালোবাসা মানে কি? –এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে অনেককে শুনেছি। বিভিন্ন সময়ে একেকজন একেকভাবে ভালোবাসাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কেউ কেউ একে বলেছেন ‘এটি একটি আবেগ যার কারণে আমাদের কাউকে ভালো লাগে।’ কেউ কেউ বলেছেন, ‘কাউকে মন থেকে স্নেহ, মায়া, মমতা দেয়াই ভালোবাসা।’ অনেকে আবার আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘ভালোবাসা হচ্ছে সিগারেটের মত, যার পরিণাম হচ্ছে পোড়া ছাই।’

আমি বিভিন্নজনের সাথে ভালোবাসা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখি যে তারা অনেক ভুল ধারণা নিয়ে আছেন। অনেকে কাউকে দেখে পছন্দ হলে বলে ফেলেন, ‘আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ আসলে এটা ঠিক নয়। এটা ভালোবাসা নয়। এটা হচ্ছে ভালো লাগা।

আমার মতে কাউকে ভালোবাসতে গেলে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আমার এখনও মনে আছে- রঙ পেন্সিল একাডেমির বর্ষবরণ ১৪১৮ অনুষ্ঠান যেদিন হল সেদিনই বিকালে আমি আমার বন্ধু মেহেদীকে নিয়ে ছাদে গিয়েছিলাম। সেদিন কথায় কথায় ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠলো। আমি মেহেদীকে ভালোবাসা সম্পর্কে যা বলেছিলাম – আমার মনে হয় তা সংরক্ষণ করে রাখা দরকার। তাই এই লেখা।

ভালোবাসা খারাপ নয়। ভালোবাসা অশ্লীলও নয়। ভালোবাসা হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম একটি অনুভূতি। ভালোবাসা যদি খারাপ কিছুই হত তাহলে আমি রঙ পেন্সিল একাডেমির ছোট ছোট বাচ্চাদের সামনে ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতে পারতাম না।

আপনি যদি অশ্লীলতা নিয়ে বিব্রতবোধ করে থাকেন তবে আপনাকে আস্বস্ত করছি যে এই প্রবন্ধটি অশ্লীল নয়। ভালোবাসা সম্পর্কে আমি শুধু ততটুকুই লিখছি যতটুকু প্রতিটি নর-নারীরই জানা থাকা প্রয়োজন।

আপনি যদি ভালোবাসা নিয়ে কোনো সন্দেহে থেকে থাকেন, আমার মনে হয় আপনার এই প্রবন্ধটি পড়ে দেখা উচিৎ। এতে আপনি হয়তো এটাও জানতে পারবেন যে আপনি কাউকে ভালোবাসেন কিনা বা কাউকে ভালোবাসার পথে আপনি
কতটুকু দূরে। আবার আপনি যদি ভালোবাসা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ (!) হন তাহলে আমার এই থিউরি সম্পর্কে আলোচনা, সমালোচনাও করতে পারবেন।

আমার মতে ভালোবাসার কিছু ধাপ আছে:


এই ধাপগুলো সবার জন্য এক না-ও হতে পারে। কেউ কেউ ভালো লাগা থেকে সরাসরি যোগাযোগ বা ভালোবাসার ধাপে চলে যেতে পারেন। আবার অনেকে যোগাযোগ থেকে শুরু করে ভালোবাসায় যেতে পারেন। আবার অনেকে হয়তো Crush-এ এসেই শেষ! মূল কথা, এটি ফ্লেক্সিবল (পরিবর্তনশীল)।

এবার ধাপগুলো সম্পর্কে একটু বলি।

১ম ধাপ – ভালো লাগা: ভালো লাগা বলতে বোঝায় ভালো লাগা আরকি। কাউকে খারাপ না লাগা। কাউকে পছন্দ হওয়া। কারো সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করা।
আমরা প্রতিদিনই বিভিন্ন ছেলে-মেয়েকে দেখি। এদের মধ্যে অনেককেই আমাদের দেখে ভালো লাগে। এক্ষেত্রে বাহ্যিক যে সৌন্দর্য্য, সেটিই প্রাধান্য পায়। অনেক সময় চেহারার এক্সপ্রেশন (ভাবভঙ্গি), পোশাক-আশাক, কথা বলার ধরণ আমাদের ভালো লাগে। অনেকে ভালো লাগাকে ভালোবাসা বলে ভুল করেন। আসলে ভালোবাসা অনেক বড় জিনিস। এটি শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি না হওয়াটাই স্বাভাবিক। মনের চিন্তারও মিল থাকা জরুরী।

ভালো লাগার রেশটা ভালো লাগা পর্যন্তই শেষ। যদি সেটা দীর্ঘায়িত হয় তখন তাহলে চলে যাবে পরবর্তী ধাপে—

২য় ধাপ – Crush: Crush মানে হচ্ছে কাউকে ভুলতে না পারা। ভালো লাগাটা কাটতে না চাইলে তখন সেটা হয়ে যায় Crush.
Crush হচ্ছে একটা অস্থায়ী অনুভূতি। কারো জন্য সাময়িক চাওয়া। এটাকে সময় দিলে এমনিতেই কেটে যায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে Crush –এর ভুক্তিতে উদাহরণ দেয়া আছে: He’s got a crush on his history teacher. সেই উদাহরণটির মতই বলা যায়, crush যে কোন সময় যে কোন অবস্থায়ই হতে পারে। টিচারের প্রতিও Crush হতে পারে, আবার বয়সে খুব বড় এমন কারো প্রতিও Crush হতে পারে। তবে এটা সিরিয়াস নাকি শুধুই সাময়িক আবেগ সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।

আচ্ছা, আমরা যদি আমাদের আলোচিত দুটো ধাপ একটি সিনেমার মাধ্যমে দেখি, তাহলে কেমন হয়? আসুন দেখি। তবে ঘাবড়াবেন না। এতে অশ্লীল কিছু নেই। কোনো নাচ-গান নেই। আটার বস্তা, চাউলের বস্তাসদৃশ নায়িকা নেই। আছে শুধু সুন্দর একটা আবেগের evolution (বিবর্তন), বেড়ে উঠা।

ধরি, আমাদের সিনেমার নায়ক মিহির। তার এইচএসসি পরীক্ষা সবেমাত্র শেষ হল। এখন তার হাতে অফুরন্ত সময়। এমন একটা সময়ে মিহিরের ছোট মামার বিয়ের কথা শুরু হল। মিহির তো মহাখুশি – ছোটমামার জন্য মেয়ে দেখতে বিভিন্ন পাত্রীর বাসায় যাবে, অবসর সময়ও কেটে যাবে। একসময় পাত্রী দেখা শুরু হল। মিহির তার মামাকে নিয়ে মুরব্বীসমেত বিভিন্ন বাড়িতে যেতে লাগলো।

একদিন ছোটমামাকে নিয়ে মিহির গেল সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক মেয়েকে দেখতে। ছোটমামার মেয়েটাকে পছন্দ হল। পাত্রীর একটা ছোট বোন ছিল – নাম লাবণ্য। বয়স তারই মত। মিহিরের যেন কি হল। এটা হয়তো চারিদিকে বিয়ে বিয়ে আমেজেরই ফল – মিহিরের লাবণ্যকে খুব ভালো লাগলো। অবশ্য লাবণ্যের সাথে মিহিরের কোনো কথাবার্তা হয় নি। শুধু এমনিতেই দেখা, দেখে ভালো লাগা।

পাত্রী ঐ মেয়েটার সাথে ছোটমামার বিয়ে ঠিক হল। ছোটমামার ইচ্ছে ছিল খুব বেশি আয়োজন না করে বিয়েটা সেড়ে ফেলা। কিন্তু কনেপক্ষ ব্যাপারটা মানবেই না। ধনী পরিবারের মেয়ে – তাই ঠিক হল ধুমধাম করে বিয়ে দিবে মেয়েটার।

বিয়ের আয়োজন বেশ ভালই হয়েছে। মিহিরও আয়োজনে হাত লাগিয়ে এখন বেশ একটু অবসর। তার এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিল। এমন সময় লাবণ্যকে দেখতে পেল মিহির। বিয়ের আয়োজনের সাথে মানিয়ে আজ একটা লাল শাড়ি পড়েছে সে। মিহির তো দেখে যেন তাকে চিনতেই পারছিল না। দেখে কথা বলার লোভ সামলাতে পারলো না। এগিয়ে গেল কথা বলার জন্য। বেশ কথাবার্তা, হাসি-ঠাট্টা হল তাদের মাঝে। তারা খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেল একে অপরের। দুজনের মোবাইল নাম্বার বিনিময় করলো।

সেদিনের অনুষ্ঠানের পর মিহির লাবন্যকে ভুলতে পারছিল না। তাকে ফোন করবে কিনা ভেবে পাচ্ছিল না। ফোন করলে যদি আবার কিছু হয়, যদি সম্পর্কটা আরো খারাপ হয়ে যায়? ভাবতে ভাবতে বৌভাতের দিন চলে এলো। আগামীকাল বৌভাত। যা থাকে কপালে ভেবে লাবন্যকে ফোন দিল সে। যা ভেবেছিল সেরকম কিছু হল না। বরং খুব ভাল লাগলো লাবণ্যের সাথে কথা বলে। সে এখন যেন আর দেখা করার জন্য অপেক্ষা করতে পারছে না। আমাদের নায়ক মশাই বোধহয় তাহলে Crush-এ পড়েছে! হুম? কি বলেন?

৩য় ধাপ – যোগাযোগ বা Communication: Crush-এর পরে এই ধাপটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগে যদি গলদ হয়ে যায় তাহলে আগের ধাপগুলোর যত বৈশিষ্ট্য ছিল, উপকার ছিল সব হারাতে হয়।

যোগাযোগ বলতে এক পক্ষের একটি কথা বা মনের ভাব অন্য পক্ষকে জানানো বোঝায়।

যোগাযোগ ফোনের মাধ্যমে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে, সরাসরি দেখা করে, এসএমএসের মাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে হতে পারে। আর শুধু কথা বলাই যোগাযোগ নয়, মনের ভাব প্রকাশ করাও যোগাযোগের মধ্যে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায় eye contact (চোখের চাহনি) অনেক কিছু বলে দেয়। আমাদের চোখেরও একটা ভাষা আছে। এই ভাষা দিয়ে আমরা অনেক কিছু বোঝাতে পারি। এবং এর জন্য চোখ টিপও দেয়ার প্রয়োজন হয় না, আমাদের মনের ভিতরের আবেগই এর জন্য যথেষ্ট।

আমরা যখন কোনো কারণে আনন্দিত হই তখন আমাদের চোখে একরকম Spark দেখা দেয়, একটা অন্যরকম রূপ দেখা দেয়। অনেকে হাসলে মনে হয় যেন চোখও হাসছে। অনেক সময় একটা মুচকি হাসি দিয়েও অনেক কিছু বলা যায়। অনেক সময় নীরব থেকেও অনেক কিছু প্রকাশ করা যায় – শুধু চোখে চোখ রেখেই সেটা সম্ভব হতে পারে।

এখন আমাদের সিনেমাতে আবার ফিরে যাই। বৌভাতে মিহির আর লাবণ্যের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। মিহির জানতে পারলো যে লাবণ্যও এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তারা দুজনে মিলে ঠিক করলো যে তারা একই ভার্সিটি ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হবে।

কোচিংয়ের ক্লাস শেষে কাছেই একটা পার্কে বসে তারা। এবং বই-খাতা খুলে ক্লাসের পড়াগুলো নিয়ে আলোচনা করে। পড়ার মাঝে মাঝে একটু হাসি ঠাট্টা, একটু গল্প-গুজব তো আছেই। আর বাসায় ফিরে কল, এসএমএস তো আছেই।

মাঝে মাঝে একে অপরের বাসায়ও যায় তারা – গ্রুপ স্টাডি করার জন্য। এভাবে দুই পরিবারের মধ্যেও ভাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেল।

ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা সামনে। ফরম তুলতে হবে, পূরণ করতে হবে, জমা দিতে হবে – অনেক কাজ! লাবণ্য একটু দিশেহারা হয়ে গেছে, কিভাবে এতগুলো কাজ করবে সে। মিহির লাবণ্যকে আশ্বাস দিলো – সবকিছুতে ও-ই সাহায্য করবে। মিহির অনেক ঝুট ঝামেলার পর ফরম পূরণ করে ইন্টারনেটে জমা দিল। লাবণ্য শুধু লাইনে দাড়িয়ে এডমিট কার্ডটা তুলে আনলো।

যোগাযোগ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমায়। আমরা যোগাযোগের আগে ভাবি অমুক লোকটা জানি কেমন। কিন্তু যোগাযোগের পর দেখি যে হয়তো লোকটি সেরকম নয়। ভালোবাসার জন্য যোগাযোগটা জরুরী। ভুল বোঝাবুঝি দূরে রাখতে যোগাযোগ রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

৪র্থ ধাপ – ভালোবাসা: হুম, এইতো! এতক্ষণ যেটার জন্য ধৈর্য্য ধরে ছিলেন – সেই আবেগ, যেটি আমাদেরকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়, ত্যাগ-তিতীক্ষা-ধৈর্য্য শেখায়। এখন সেই আবেগ নিয়েই আমরা কথা বলবো।

আমি এই প্রবন্ধে ভালোবাসা শুধু প্রণয় অর্থে ব্যবহার করেছি। কিন্তু ভালোবাসা স্নেহ, মায়া, মমতা থেকেও আসে। নতুন একটি শিশুর জন্ম হলে মা তাকে লালন পালন করে। শিশুটি সময়ে অসময়ে জ্বালাতন করে – কাঁদে, ঠিকমত ঘুমায় না, খায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এতকিছুর পরও যে কারণে মা তার সন্তানটিকে ফেলে রেখে যেতে পারে না তা হল – ভালোবাসা।

অনেক সময় ভালোবাসা আসে শ্রদ্ধা, সম্মান থেকে। যেমন: আমরা আমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদীকে শ্রদ্ধাভরে ভালবাসি।

প্রণয় অর্থেই হোক, আর মায়া-মমতা-সম্মান অর্থেই হোক, ভালবাসা মানে হল কারো ভাল চাওয়া।

এখন আবার একটু প্রণয়ের দিকেই ফিরে আসি। যখন একটা ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবাসে তখন তারা একে অপরের ব্যাপারে care করে, ভাবে। একজন আরেকজনের ব্যাপারে ছোটখাট বিষয় নিয়েও মাথা ঘামায়। একজন আরেকজনের ক্ষতি দেখতে পারে না বরং সবসময় তার ভাল চিন্তা করে। একজন আরেকজনকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। একে অপরকে সবসময় দেখতে ইচ্ছে করে, একসাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মনের ভিতর আগলে রাখতে ইচ্ছে করে। একজন আরেকজনকে দেখলে বুকের ভেতরে একটা শান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একজন আরেকজনের দিকে তাকালে মনে হয় যেন, ‘দুচোখ ভরে দেখি।’ ভালোবাসা মানে জাস্ট আপন করে পাওয়া – একে অপরের প্রতি অধিকার সৃষ্টি হওয়া। এই তো! আরো কিছু আছে কি? থাকতেই পারে। তাই আপনার ভাবনাগুলোর জন্য কিছুটা জায়গা ফাঁকা রাখলাম, অনেকটা বিরতির মত। এই বিরতিতে আপনিও একটু ভাবুন, আপনার কাছে ভালোবাসা মানে কি।

...

...

...

আমাদের সিনেমার নায়ক নায়িকাদের মধ্যে কিন্তু এখন ভালোলাগাটা অনেক গভীর হয়েছে। তারা একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারে না। ওদের ভাগ্য ভাল যে ওরা দুজনেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে, যদিও দুজনে ভিন্ন বিষয়ে লেখাপড়া করছে।

ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে তারা এখন। ছোটমামার শ্বশুরবাড়ির ওদিক থেকে একটা বনভোজনের প্রস্তাব এলো। ছোটমামাও না করতে পারলো না। কিন্তু সমস্যা হল সিট নিয়ে। সব আত্মীয়-স্বজনকে জায়গা দিতে গেলে মিহিরের আর জায়গা হয় না। অবস্থাটা এমন যে মিহিরকে নিতে গেলে আরেকটা বাস শুধু ওর জন্য ভাড়া করতে হবে। এদিকে মিহির না গেলে লাবণ্যও যাবে না।

ভালোবাসার অন্যতম আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে Sacrifice (ত্যাগ স্বীকার করা)। ভালোবাসার মানুষটির জন্য অনেক সুবিধা ছেড়ে দেয়া বরং অনেকটা আনন্দের বিষয় হয়ে থাকে। যেমন: বাবা-মায়েরা নিজেদের জন্য খরচ না করে সন্তানদের জন্য খরচ করে। বাবা-মায়েদের ভালোবাসা আসলে ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

যাই হোক, পরে একদম বলতে গেলে শেষ মুহূর্তে দেখা গেল মেজো মামার অফিসে একটা জরুরী কাজ চলে এসেছে। ওনাকে সপ্তাহখানেকের জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে। তাই ওনার সিটটা এখন মিহিরের জন্য খালি। ব্যস! লাবণ্য মিহির দুজনেই মহাখুশি – তারা একসাথে কক্সবাজার যাবে।

যাওয়ার পথে অনেক মজা হল। গান-বাজনা-কৌতুক, এটা সেটা করতে করতে কক্সবাজার এসে হাজির। কক্সবাজারের সি-বিচটা এর আগে মিহির লাবণ্য কখনো দেখে নি, অন্তত সামনা সামনি নয়। সমুদ্র সৈকতটা এক অদ্ভুত জায়গা। সমুদ্রের গর্জন, খোলা বাতাস, আর মানুষের কলকাকলিতে ভরপুর। মন-প্রায় উভয়ই জুড়িয়ে যায়।

লাবণ্য মিহির কিছুক্ষণ খালিপায়ে বিচের বালিতে হাটলো। মাঝে মাঝেই সমুদ্রের ঢেউ এসে তাদের পা ভিজিয়ে দিলো। সময় যে কোনদিক দিয়ে ফুরিয়ে গেল তারা টেরই পায় নি। একসময় সূর্যাস্তের সময় হয়ে এলো। তারা বিচের একটু পেছনের দিকে এসে পড়েছিল। একটু একাকী কথা বলার জন্য। সেখানে দাড়িয়ে তারা সূর্যাস্ত দেখছিল। নিজ চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা কত মনোমুগ্ধকর। সূর্যটা আস্তে আস্তে সমুদ্রের বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।

মিহির লাবণ্যের দিকে তাকালো। লাবণ্যের সেদিকে খেয়াল নেই। লাবণ্য একাগ্রচিত্তে সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। সূর্যের যতটুকু আলো অবশিষ্ট ছিল তার মধ্যেই লাবণ্যের চেহারাটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। কি যেন কি হয়ে গেল, হঠাৎ করে সে লাবণ্যের মুখোমুখি এসে হাটু গেড়ে বসে পড়লো। মিহির নরম গলায় বললো, ‘আমি অনেকদিন চেষ্টা করেছি বলার। কিন্তু আজ যদি না বলি তাহলে কখনোই হয়তো বলা হবে না। ... লাবণ্য, আমি তোমায় ভালবাসি।’

লাবণ্য হাত ধরে মিহিরকে তুললো, আর বললো, ‘আমিও তোমায় ভালবাসি। আমিও তোমার মনের কথা জানার অনেক চেষ্টা করেছি। আমিও তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম।’

...

আপনারা কি লাবণ্য আর মিহিরের মধ্যে থাকা ভালোবাসা টের পেয়েছেন? যদি সেই ভালোবাসা বুঝতে পারেন তাহলে আমার লেখা স্বার্থক হয়েছে।


আমি এই লেখাটি এজন্য লিখলাম কারণ আমি বর্তমান প্রজন্মের মাঝে ভালোবাসার ব্যাপারে অনেক ভুল ধারণা দেখেছি। আমি চেষ্টা করেছি শুদ্ধ ভালোবাসা কি সেটা বোঝাতে। অনেকে প্রেম করাকে একটা “যোগ্যতা” মনে করে। এবং প্রেমের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করে। এটা আসলে ছোট মনের পরিচয় প্রকাশ করে।

অনেক ছেলে-মেয়েকে আমি একসাথে বসে থাকতে দেখেছি অথচ তাদের মধ্যে শুধু ভালো লাগা দেখতে পেয়েছি, ভালোবাসা নয়।

ভালোবাসা দেখানোর প্রয়োজন হয় না, ভালোবাসা এমনিতেই প্রকাশ পায়।

ভালোবাসার জন্য তাড়াহুড়ো করা উচিৎ নয়। বন্ধু বান্ধবরা যতই বলুক ‘তুই এ্যাফেয়ার করিস না ক্যান? ব্যাকডেটেড কোথাকার!’ তাদের কথায় কান দিতে নেই। আমাকেও এরকম অনেক কথা শুনতে হয়েছে। এবং এটা একরকম বিরক্তিকর ব্যাপার। চাইলেই কাউকে ভালোবাসা যায় না। জোর করে কাউকে ভালোবাসা যায় না। এজন্য মনের ভেতর থেকে অনুভূতি তৈরি হওয়া প্রয়োজন।

আমি মানবপ্রমে বিশ্বাসী, অর্থাৎ সবাইকে ভালোবাসি। আমি যখন কথা বলি তখন প্রতি মুহূর্তেই খেয়াল রাখি যেন সামনের মানুষটিকে আমি দুঃখ না দিই। আমার নিতান্ত অপছন্দের না হলে আমি কাউকে ঘৃণা করি না। আমি আমার Teenage বয়সটা রাসূল (স.)-এর মত হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি জানি ওনার মত আমি হতে পারবো না, কিন্তু অন্তত চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই। তিনি একজন মানবপ্রেমী ছিলেন। সবসময়ই সবার সাথে ভদ্র আচরণ করতেন।  আমিও চেষ্টা করি যথাসম্ভব উত্তেজিত না হয়ে সবার সাথে মিশতে। (লজ্জার কথা আর কি বলবো, আমি একজন introvert. সামাজিকতা অত ভাল পারি না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাই।)

আমি কখনো কাউকে সেরকম অর্থে ভালোবেসেছি কিনা –অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করে। আমি সন্দিহান – কিভাবে উত্তরটা দিব। উত্তরটা দেয়ার পর হয়তো এই লেখাটা আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। তাই উত্তরটা লেখায় না নিয়ে আমার কাছ থেকে সামনা সামনি পেলে বোধহয় ভালো হয়।

ভালোবাসা আমাদের চারিদিকেই আছে। এটাকে মুরব্বীরাও অস্বীকার করতে পারবেন না। ভালোবাসা অশ্লীল নয়, কিন্তু আমরা সেটাকে অশ্লীল বানিয়ে ফেলেছি। আধুনিকতার নামে আমরা ভালোবাসাকে একরকম Torture করছি। ‘ডেট করলাম, ডাম্প করলাম’ এরকম একটা যুগে ভালোবাসার শালীন রূপটার দেখা পাওয়াও আসলে কঠিন। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি আমার দৃষ্টি থেকে ভালোবাসার আসল রুপটা আপনাদেরকে দেয়ার জন্য। ভালোবাসা কোনো পাপ নয়, এটা একটা glue যেটা পৃথিবীকে এখনও একসাথে করে রেখেছে, মনুষ্যত্ব টিকিয়ে রেখেছে। একজন অন্ধ মানুষ রাস্তা পার না হতে পারলে আমরা তাকে পার করে দিই – এটা ভালোবাসারই রূপ।

আমরা জেনে, না জেনে অনেককে ভালোবাসি। ভালোবাসা আমাদের মাঝে আছে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না এর উপস্থিতিটা কোথায়। অথবা বুঝতে পারলেও সেটাকে নোংরা বানিয়ে ফেলি।

সবকিছুতেই আমরা ভেজাল মিশিয়ে ফেলেছি, ইবাদতেও পর্যন্ত। কিন্তু অন্তত একটা জিনিস তো খাঁটি থাকা উচিৎ, কি বলেন?

আদনান শামীম

(২৯ আগস্ট ২০১১)

5 comments:

clicker heroes said...

অনুষ্ঠান যেদিন হল সেদিনই বিকালে,.. আমি আমার বন্ধু মেহেদীকে নিয়ে ছাদে গিয়েছিলাম। সেদিন কথায় কথায় ভালোবাসা নিয়ে কথা উঠলো। আমি মেহেদীকে ভালোবাসা সম্পর্কে যা বলেছিলাম –.. আমার মনে হয় তা সংরক্ষণ করে রাখা দরকার। তাই এই লেখা।

bubbles said...

It was a long but beautiful article, really hard to find such articles, thank you.

candy crush soda said...

Thank you very much for these great cake recipes, I have learned a lot from your web blog

8 ball said...

Your feedback helps me a lot, A very meaningful event, I hope everything will go well

basketballlegends said...

I translated the article into English and read it. It's a really laborious article. Thank you very much.

 

Blogroll

Translate This Blog

Copyright © আদনানের ব্লগ Design by BTDesigner | Blogger Theme by BTDesigner | Powered by Blogger