Thursday, May 7, 2015

গল্প: রাহির গল্প

1 comments
রাহির গল্প

রাহির সাথে সুমনের দেখা হয় না অনেক দিন। দুপুরগুলো খুব নীরবে কাটে তার। খুব নীরব। মাঝে মাঝে মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই তার সাথে রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কি অদ্ভুত নিস্তব্ধ শহর -- সে অবাক হয়। রোদটাও কেমন যেন বাজে রকমের একঘেয়ে। ভরা দুপুরের নীরবতাকে কিছুটা হালকা করতে কিছু তৃষ্ণার্ত কাক কোথায় যেন কা-কা করে বেড়ায় মাঝে মধ্যে। কিন্তু সেটা রাহির মনে এতটুকু স্বস্তি দেয় না।

বড় একা রাহি। নীরব দুপুর যেন তার একাকীত্বকে আরো ঘণীভূত করে দেয়। তার মনের দুঃখগুলো এই একাকীত্বের সুযোগে যেন আতশীকাচেঁর মধ্য দিয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। মাঝে মাঝে এই দুঃখগুলোকে ভুলে থাকতে চায় সে। আবার মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দেয়। মাঝে মাঝে হেডফোনে গান শুনে মনকে ভুলিয়ে রাখে।

“কি হয়েছে তোর?” – আগে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন রাহির মা। রাহির মা অতটা শিক্ষিত না। রাহি এখন স্কুল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। রাহির মা তাই তার শিক্ষিত মেয়েকে তেমন একটা ঘাটাতে সাহস পান না। বলে বলে ক্লান্ত হয়ে একসময় তিনি তার নিজের কাজে মন দেন।

রাহি প্রায় একমাস হল ভার্সিটিতে যায় না। কেউ তাকে ফোনও দেয় না -- তার ফোন বন্ধ তাই। কি যেন হয়েছে তার, শুধু বাসায় বসে দিনযাপন করে সে। ঠিকমত খায় না, কথা বলে না। ঘড়ির কাঁটা বা ক্যালেন্ডার – কোনটার হিসেবের দিকেই তার কোন মন নেই।

রাহি শুধু ভাবে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেয়। বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার ভাবে। কি ভুল করেছিল সে? তার সঙ্গে যা হয়েছে তা তো অন্যকারো সাথেও হতে পারতো। তার সাথেই কেন। তারপর কিছুক্ষণ সবকিছু চুপ। একদম নিশ্চুপ। যেন পুরো পৃথিবীটা তার পরবর্তী কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। তারপর পুরো জীবনটা ভেসে উঠে তার মনের কল্পনায়।

রাহির আজ একটু ভাল লাগছে। মাসখানেক পর সে আজ প্রথমবার গোসল করলো। অনেক হালকা লাগছে তার এখন। মনে হচ্ছে শরীরের ময়লার সাথে তার মনের সব দুশ্চিন্তাগুলোও ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। মনটা অনেক ফুরফুরে হয়ে গেছে। এখনই পৃথিবীটাকে জয় করে ফেলতে মন চাইছে তার।

এমনই মুহূর্তে জানালায় হালকা একটা টোকার মত আওয়াজ হল। রাহির চুলে তখনো তোয়ালে জড়ানো। জানালাটা বারান্দার সাথে। সে আলতো পায়ে জানালার কাছে গেল। একটু ইতস্তত করে জানালা দিয়ে তাকালো। নাহ্ বোঝা যাচ্ছে না। তার হালকা ভেজা গায়ে তখনো পসাধনীর ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু তা-ও তার কৌতুহল সইলো না। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। টোকাটা কিছুই নয়। শহরে এরকম কত শব্দ শোনা যায়। কিন্তু কেন যেন তার মনে হচ্ছে এই টোকাটা অন্যরকম ছিল। সে বারান্দার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে ভাবছিল ঢিলটা যে মেরেছিল সে খুব ঝানু। নাহলে বারান্দা টপকে এই ঢিল... একি!

রাহি যেন অবশ হয়ে গেল। তার স্থির চোখ দুটোতে ভয় আর ঘৃণাভরা এক অভিব্যক্তি। সে অবাক-নির্বিকার। সেই কুৎসিত চেহারাটা... ইস! যাকে সে একমাস ধরে ভোলার চেষ্টা করেছে, সেই ভয় এখন তার সামনে।

কি করবে এখন সে? বুঝতে পারছে না। আকস্মিকতায় সে বসে পড়ে বারান্দায়ই। তার বুক থেকে গলা বেয়ে কান্না আসতে চাইছে। সেটা সে মুখে হাত চেপে সইছে।

কি করবে এখন রাহি? নিশ্চুপ-নির্বিকার সে চুপচাপ বসে রইল। কতক্ষণ কেটে গেছে সে জানে না। কতক্ষণ? এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, দুই ঘণ্টা? জানে না। সবকিছু যেন তার নতুন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর আকাশ, পৃথিবীর বাতাস সবকিছুই নতুন। এই নতুন বাতাসে শ্বাস আঁটকে যাচ্ছে তার। এই পৃথিবীর আকাশ চিড়ে যদি অন্য কোথাও যেতে পারতো সে। যদি নতুন কোন এক গ্রহে বসবাস শুরু করতো সে। শুধু একা, আর কেউ থাকবে না।

“রাহি!” হঠাৎ তার নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে রাহি। পিছনে ফিরে দেখে তার মা। “খেতে আসবি না? খেয়ে নে চল।” রাহি তার মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত পর তার খেয়াল হয় সেই আগন্তুকের। ভীতচোখে সে তাকায় রাস্তার দিকে। কই, কোন মানুষ তো নেই! তাহলে কি কুৎসিত মানুষটা কেবলই তার কল্পনা?

“হুম, আসছি” মার দিকে না তাকিয়েই সে জবাব দেয়। তার মা চলে যায় আর সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যদিও তীব্র অপরাধবোধ তার মন থেকে কাটে না, কিন্তু ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি পায় সে।

নাহ্ সব তার মনের ভুল। নিজেকে আনমনে দোষারোপ করে সে – পাগলী, ও তোমার বাসা চিনবে কি করে? তুমি কি ওকে কখনো বাসায় এনেছ? উহুম, মোটেও না। নিজেকে দোষারোপ করতে করতেই সে উঠে পড়ে খেতে যাবে বলে। নিজেকে সামলে নেয় সে। নিজেকে বোঝায়, কিচ্ছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি। আসলে সব মনের ভুল। সে কখনো... একি! ঢিলটা এলো কোত্থেকে বারান্দায়?

।।।

কতক্ষণ ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে সে। কিন্তু ঘুম আসছে না। শুধু এপাশ আর ওপাশ। চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম আসছে না। ভুলে থাকার চেষ্টা করছে রাহি, কিন্তু বার বার সেই চেহারাটা ভেসে উঠছে মনে। কুৎসিত ভয়ংকর সেই চেহারাটা।

অথচ সেদিনও চেহারাটা কত প্রিয় ছিল। ভার্সিটির সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল সে। তাকে ছাড়া ক্যান্টিনে খাওয়া, আড্ডা -ভাবাই যেত না। সবসময় হাসিমুখটা কেমন এখন কুৎসিত লাগে তার কাছে। ভাগ্যিস সুমনকে সে পেয়েছে ভাবার জন্য। নাহলে সেই কুৎসিত মুখটা তার জীবনকে আরো বিষিয়ে দিতে পারতো।

করিডোরে সেই ঘটনাটা হওয়ার পর থেকেই তাকে এড়িয়ে চলে রাহি। সে তাকে কতবার বলেছে, “দ্যাখ, তুই এগুলো করিস না। লোকে আমাকে খারাপ ভাববে।” মারুফ কিন্তু নাছোরবান্দা, সে বলে “লোকে মাইন্ড করলে আমার কি? আমি তো তোর ফ্রেন্ড।” রাহি কিছু বলতে পারে না। বলতে পারে না যে হঠাৎ হঠাৎ তার হাত ধরাটা রাহির সহ্য হয় না রাহির। সুমন দেখে ফেললে কি হবে! – সে তো রাতে ঘুমাতেই পারবে না। ও একটু সেনসিটিভ কিনা! তবে ছেলে খুব ভাল।

দুই বছর যাবত রাহি-সুমনের প্রেম চলছে, অথচ মারুফরা কিছুই জানে না। লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে তারা দু দু’টি বছর। রাহি খুব ভালোবাসে সুমনকে, কিন্তু সুমন তা জানে না। সুমন জানে সে ভেবে দেখছে!

রাহি মাঝে মাঝে ভাবে, মানুষ এত ভাল হয় কি করে? সুমনকে সে যা-তা বলে, অথচ সে বেহায়ার মত আবার তার কাছে আসে। সে কোন দোষ না করলেও রাহির কাছে সে উল্টো ক্ষমা চায়। মনে মনে হাসে রাহি, “বোকা ছেলে!”

তবে এই বোকা ছেলেটাকেই মন দিয়ে ফেলেছে সে! কেন যেন তাকে দেখলে আর কাউকে ভাল লাগে না, আর কাউকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে না। সুমনকে ভেবে ভেবে সে বোধহয় দিন পার করে দিতে পারবে কিন্তু ওর ভাবনা ফুরোবে না!

এই ভালোবাসার গল্পে মারুফ এসেছে কাবাবে হাড্ডির মত। ওকে যে কিভাবে বোঝাবে সে। বন্ধু মানুষ, কিছু বলতেও পারে না। তবে ওর সাহচর্য ভাল লাগে তার। ও খুব ফানি তো! ওকে ছাড়া আড্ডাই জমে না। কিন্তু মারুফ যে এমন একটা জঘণ্য কাজ করবে সেটা সে ভাবতেও পারে নি। না না। মনকে বোঝায় সে, “কিচ্ছু হয় নি। সব কল্পনা। সবকিছু ঠিক আছে।”

কিন্তু মন তো বাধা মানে না। মারুফকে নিয়ে এখনও তার চিন্তা শেষ হয়নি। কেন এমন করলো মারুফ? ওকে তো সে বিশ্বাস করেছিল।

নাহ্, আর ভাল লাগছে না। সে উঠে চলে গেল বারান্দায়। আজকের জোৎন্সাটা না অসাধারণ! মনে মনে সে কল্পনা করে, সুমন এসে তার হাতটা ধরলো। সুমন তার দিকে হাসিমুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। খুব ভাল লাগছে রাহির। ঠিক তখনই একটা হালকা বাতাসের ছোঁয়া এসে তাকে স্বর্গীয় আনন্দ দিয়ে গেল।

।।।

সকালে রাহির ঘুম ভাঙে তার মার ডাকে। “রাহি! রাহি! এই রাহি ওঠ তো। দ্যাখ কে এসেছে তোর সাথে দেখা করতে!”

রাহি বিরক্ত। “কে?”

“আরে ওঠ তো।”

“কে আসবে আমার সাথে দেখা করতে?” বলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করে সে।

“আরে তোর ভার্সিটি থেকে একটা ছেলে এসেছে।” একথা শুনে সে ঝট করে উঠে পড়লো। মনে মনে ভাবলো, সুমন না তো? এবার আর সে ভুল করবে না। ক্ষমা চেয়ে নিবে সে। মারুফ যা করেছে তা সবকিছু বলে দেবে। প্রয়োজন হলে পা ধরে ক্ষমা চাইবে সে।

উত্তেজনায় তার গলা ধরে আসছে। কোন রকমে বলল, “কোথায়?”

“ড্রইংরুমে বসে আছে। সে কে হয় রে তোর? চিনিস তো?” তার মা-ও বুঝতে পারছে না কি ব্যাপার স্যাপার।

রাহি যেন তার মার কথাটা শুনতেই পায় নি। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। সুমন এতদিন পর এসেছে, আর সে এভাবে দেখা করবে। পাগলীর মত দেখাচ্ছে তাকে। আয়নায় তার নিজের চেহারা দেখে লজ্জা পায় সে। কিন্তু সেটা মা-কে বুঝতে দেয় না।

সে বুঝতে পারছে না এখন সে কি করবে। মেকাপ করবে? হাতমুখ ধুবে? কাপড় কি চেঞ্জ করবে? তাকে সুন্দর দেখা গেলে হয়তো সুমন তাকে ক্ষমা করে দেবে। সে যখন এসব ভাবছিল ঠিক তখনই হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন একটা ফেরেশতা বলে উঠলো, “রাহি, অনেস্ট হ। যেভাবে আছিস সেভাবে যা। ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ক্ষমা নিস না।” অনেক ভেবে চিন্তে সে কেবল হাত মুখ ধুয়ে, চুলটা আছড়ে নিল। রাহি যখন চুল আছড়াচ্ছিল, তখন আয়নার ওপারের রাহির সাথে তার চোখাচোখি হচ্ছিল। সেই মনের ফেরেশতা তখন বলল, “তুই নষ্টা। তুই নষ্ট হয়ে গেছিস। ও তোকে জীবনেও ক্ষমা করবে না। ...তুই অনেক ছোট হয়ে গেলি রে!” কথাগুলো শুনে তার একটু ভয় হচ্ছিল। সে যদি তাকে ক্ষমা না করে? সুমনকে ছাড়া সে বাঁচবে কি করে?

রাহি মাকে বলল, “মা, তুমিও চলো আমার সাথে।” আবার কি একটা ভেবে বলল, “থাক তুমি ভেতরে চলে যাও, আমি না ডাকলে এসো না।”

সে একাই ড্রইংরুমের দিকে হাঁটা দিল। হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবছে, কিভাবে কথাগুলো বলবে। সে পারবে – মনে মনে ভাবছে সে। কলেজজীবনে বাণিজ্য মেলায় সেলস গার্লের কাজ করেছিল সে, এয়ার কন্ডিশনের। আঠারোটা সেল করেছিল সে! সবাইকে টেক্কা দিয়েছিল তার সেলের পরিমাণ। সে কথায় না পারলে, আর কে পারবে? মনের ফেরেশতা আবার বলল, “কথা দিয়েই কি সব হয়? তুই তো নষ্টা। তোর কথায় কেউ বিশ্বাস করবে না।... ক্ষমা পাবি না... ক্ষমা পাবি না... নষ্টা মেয়ে।” এখন তার মনে পড়লো, কি নিষ্ঠুর আচরণ করত সে সুমনের সাথে। সুমনের সাথে রাগ করে সে কথা বলতো না, সে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করতো না। কি নিষ্ঠুর এক নির্দয় মেয়ে ছিল সে। তার আরো ভাল মেয়ে পাওনা ছিল। রাহির চেয়ে মারিয়াকে সুমনের সাথে বেশি মানাতো। মারিয়া নামে একটা মেয়ে পড়ে ওর ক্লাসে। মেয়েটা অনেক ভদ্র। ওকে খুব পছন্দ হত সুমনের...

এসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে সে একসময় ড্রইংরুমের পর্দার সামনে চলে এলো। পর্দার ওপারেই সুমন তার জন্য অপেক্ষা করছে। একটা বড় শ্বাস নিল, তারপর নিশ্বাস ছাড়লো। আর সইলো না, পর্দা সরিয়ে ফেলল সে। সরিয়ে ও যা দেখলো তাতে সে নিজেকে আর বিশ্বাস করতে পারল না। ওর জন্য সে এত প্রস্তুতি নিল, এই দানবটার জন্য? একটু ধাতস্ত হতেই ভাবলো এই হায়েনাটা আমার ঠিকানা পেল কি করে? সেকি মাকে সব বলে দিল নাতো? নষ্টা মেয়ের গল্পটা কি সবার জানা হয়ে গেল তাহলে? নিজের অজান্তেই সে বসে পড়লো কাছের একটা সোফায়।

“কেন এসেছিস?” চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল সে। “তোকে আমি চিনি না। তুই চলে যা।”

“কেন? কথা বলবি না?” মারুফের নির্লিপ্ত উত্তর।

রাহির মুখ ঘৃণায় ভরে উঠলো, “তোকে আমি পুলিশে দিব।”

“রাহি, দোস্ত, একটা কথা শোন। দ্যাখ, তুই আমাকে ভুল বুঝছিস।”

রাহি দাড়িয়ে গেল, “তুই বেরিয়ে যা।” চোখগুলো তার মাতালের মত লাল হয়ে গেছে। “আর জীবনে কখনো আমার সাথে কথা বলবি না।”

রাহি ভেতরে চলে যাচ্ছিল। তখনই মারুফ বলল, “রাহি, আমরা ফান করেছিলাম। সেদিন আসলে কিছুই হয় নি।”

“কি?” রাহি অবাক।

“তুই যেদিন আমাদের সাথে বেরিয়েছিলি সেদিন ঘুরতে ঘুরতে তুই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলি। তুই জ্ঞান হারানোর পর আমি আমার ডাক্তার বন্ধুকে ফোন দিয়ে সিম্পটম বললাম। সে বলল চিন্তার কোন কারণ নেই, কাছাকাছি কোন হাসপাতালে নিয়ে গেলেই হবে। আমি তখন দেখলাম যে তোর অবস্থা বেগতিক, হাসপাতালে নিতে গেলে সময় লাগবে। তখন আমার বন্ধু একটা ইঞ্জেকশনের নাম বলল। সেটা কাছের একটা ফার্মেসি থেকে নিয়ে এসে পুশ করে দিলাম।”

মারুফ একটু থেমে লক্ষ্য করল রাহির অবস্থা। রাহি একটু একটু করে শান্ত হচ্ছে। “তুই তো জানিস আমি কেমন। ভাবলাম এই তো সুযোগ। তুই ওঠার পর কাহিনী বানালাম যে আমি ড্রাগ ডিলার। ভার্সিটির সব সুন্দরীদের কাছে আমি ড্রাগস বিক্রি করি। সুন্দরী হওয়ার জন্য এই ড্রাগস সবাই নেয়। ভার্সিটিতে এটা খুব জনপ্রিয়। ... আমি তোকে এই ড্রাগ পুশ করে এডিকটেড বানিয়ে দিয়েছি। ... আরে আরে!”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সোফার বালিশ দিয়ে মারুফকে মারা শুরু করে দিল রাহি।

“তুইও বোকা, এসব গালগপ্পো বিশ্বাস করে আনারের মত সুন্দর চেহারাটাকে পেয়ারার মত বানিয়ে রেখেছিস! সুন্দর হওয়ার জন্য আবার ড্রাগস! হাহাহা!” মারুফের মুখে শয়তানের হাসি।

“তুই জানিস, আমি কি অবস্থার মধ্যে কাটিয়েছি। আমি তো আত্মহত্যাও করতে পারতাম, ঠিক না?” এখনও রাগ আছে রাহির।

“আমি তোর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তোর ফোন বন্ধ পেয়েছি। এতদিন ফোন বন্ধ, ভার্সিটিও যাস না – এসব দেখে খোঁজ নিলাম তোর বান্ধবীদের কাছ থেকে। তারপর নিজেই সেদিন চলে এসেছিলাম তোর বাসায়।”

রাহির রাগ তখনও থামে নি। মারুফ বলছেই, “সেদিন জানিস, আমি তোকে খুব ভয় পেয়েছিলাম রে! ভয়ে তোর দরজা পর্যন্ত আসতে পারি নাই। তাই জানালায় ঢিল ছুড়েছিলাম। তুই আসলি না। ... থাকতে না পেরে আজ বাসায় চলে এলাম। স্যরি, মাফ করে দে।”

“এতদিন পর এসেছিস ক্ষমা চাইতে? আমি তোকে কক্ষনো...”

“আমি জানি আমি ভুল করেছি। কিন্তু আমি এত বোকা না। আমি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। দরজার বাইরেই ওকে দাড় করিয়ে রেখেছি!”

ও বুঝতে পারছে না, ওর কান কি ধোকা দিল? সে বলতে কে? মারুফ কি তাহলে আগে থেকেই জানতো? সব চিন্তা বাদ। সে আজ সবকিছু উসুল করে নিবে, এতদিন সে কোথায় ছিল? দেখি হতচ্ছাড়াটা কোথায়। দরজা খুলে সে দেখে রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে আছে সুমন।

রাহির রাগ কোথায় যেন উবে গেল। রাহি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে আবিষ্কার করলো সুমনের আলিঙ্গনে। রাহি জানে না কতক্ষণ কেটেছে। রাহি শুধু অনুভব করছে। রাহি তার কানের কাছে গিয়ে বলল, “ভালোবাসি।”

সুমন মনে মনে অনেক খুশি হয়েছে, কিন্তু সেটা লুকাতে চাইলো। “এতদিন লাগলো?”

সে এখন অনুভবে ব্যস্ত। এতকিছু বলার সময় নেই তার, “স্যরি।” মিনিটখানেক পর বলল, “প্রমিস। আর কক্ষনো এমন করবো না।”

“এখন থেকে কিন্তু প্রতিদিন বলতে হবে।”

“আচ্ছা।”, সম্মতির সুর রাহির গলায়।

সুমন জিজ্ঞেস করে, “কোনটা বলবে বুঝেছ?”

“স্যরি।”

____________________________________
( লিখেছেন আদনান শামীম )
Continue reading ...

Monday, May 4, 2015

অনুবাদ: হারতে হারতে জেতার উপায়

0 comments
আমি আমার শৈশবকালের অনেকটাই আঁকার মধ্যে কাটিয়েছি। যখন আমি কলেজে ভর্তি হলাম, তখন আমি পেন্সিলের ব্যবহার বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছি। আমার শিক্ষক ছিলেন খুব ভাল একজন শিল্পী, নাম উইল রেইম্যান।

তাকে খুশি করার জন্য আমি আমার সবচেয়ে ভাল কৌশলগুলো আমার কাজে দেখানোর চেষ্টা করছিলাম: বিভিন্ন রকম লাইন, বিভিন্ন শেড মিলিয়ে দেয়া। একদিন আমি মনযোগ দিয়ে আঁকছিলাম। হঠাৎ করে আমার স্কেচ প্যাডের উপর টুপ করে কি যেন একটা পড়লো। দেখি সেটা একটা মেকানিকাল ড্রাফটিং পেন।

“এখন থেকে এটা দিয়ে আঁকবে” রেইম্যান স্যার বললেন। আর তিনি শয়তানের মত একটা হাসি দিয়ে চলে গেলেন।

উফ, কলমটাকে যে আমি কি পরিমাণ ঘৃণা করতাম! সেটা দিয়ে শুধু একইরকম গাঢ় কালো লাইন আঁকা যেত। এতে করে আমার পেন্সিলের বিভিন্ন চালাকিগুলো কাজে লাগাতে পারছিলাম না। আপনি হয়তো ভাবছেন যে আমার শিক্ষক আমাকে সাহায্য করতেন অথবা, একটু ছাড় দিতেন। কিন্তু না। তিনি আমার কুৎসিত কালির আচড়ে আঁকা ড্রইংগুলো দেখে চিৎকার করে বলতেন, “ওহ ঈশ্বর,” আর মাথাটা হাত দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরে হেঁটে চলে যেতেন যেন তার মাথায় মাইগ্রেনের ব্যাথা আছে। এর ফলে আমার আর্টের গ্রেডে রীতিমত ধ্বস নামলো। আমি ভীষণ হতাশ হয়ে গেলাম।



কয়েক সপ্তাহ পরে, আমি যখন আরেকটা ক্লাসে আমার কলঙ্কিত কুৎসিত কলমটি নিয়ে বসে ছিলাম, তখন একটা ঘটনা ঘটলো। ক্লাসের মাঝেই আনমনে, আমি কলমটা হাতে নিয়ে খাতার উপর নাড়ছিলাম। পরে দেখি, ওগুলো অদ্ভুত সব চিহ্ন তৈরি করেছে। কিছু বৃত্ত, অর্ধ্ববৃত্ত, দাগ ইত্যাদি।

এই ঘটনার পর আমি পরবর্তী যে ছবিটি আঁকলাম সেটি একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। প্রতিযোগিতার একজন বিচারক জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি কিভাবে বুঝলে যে ড্রাফটিং পেন দিয়ে এরকম ছবি আঁকা যায়?”

আমি জবাব দিয়েছিলাম। “আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম। বার বার, অনেকবার।”

তারপর থেকে আমি অনেকবার ব্যর্থতাকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করেছি, আমার নিজের এবং অন্যদের ক্ষেত্রে। আমার জীবনের বিদ্যালয়ে আমি শিখেছি সফল ও ব্যর্থ মানুষদের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়। পার্থক্যটা হলো যে সফল মানুষেরা ব্যর্থ হন বেশি

আপনি যদি ব্যর্থতাকে একটি দৈত্য হিসেবে চিন্তা করে থাকেন, যেটি আপনার পেছনে তেড়ে আসছে, অথবা আপনার জীবনকে পুরোই ধ্বংস করে দিয়েছে, তাহলে আরেকবার একটু ভাবুন। সেই দৈত্যটিই আপনার জন্য উপকারি এক শিক্ষক হতে পারে। আপনাকে হয়তো সে এমন সব সফলতার মুখ দেখিয়ে দিতে পারে যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।

হেরে যাবার ইচ্ছাকৃত বেদনা

আমার কুকুর-পালা বন্ধু লরা। সে বিভিন্ন জাতের কুকুর লালন পালন করে। তার মধ্যে অনেকগুলো পুরষ্কার জেতা কুকুরও আছে। এক বিকালে তার সাথে ডগ পার্কে দেখা। তাকে খুব বিষন্ন মনে হচ্ছিল।

“কি হয়েছে?” আমি লরাকে জিজ্ঞেস করলাম। আমাদের কুকুর দুটো তখন একসাথে খেলছিল।

লরা বললো “টমি,” মাথা নেড়ে কুকুরটাকে দেখালো। সুন্দর করে আচড়ানো তার লোমশ একটা কুকুর।  “সে গতকালের শো-তে প্লেস করে নি। একটা... প্লেসও... করলো না! আর সে হারতে পছন্দ করে না!” তার কণ্ঠস্বর এতটাই তিক্ত ছিল যে আমি রীতিমত অবাক হলাম। সে বললো, “শো-তে ওর প্রথম হওয়া উচিৎ ছিল। তাকে দেখ, সে সব দিক থেকে পারফেক্ট!”

আমি টমির দিকে তাকালাম। সে সুন্দর – এটা ঠিক। কিন্তু পারফেক্ট? কি জানি? ওর পাগুলো অনেক লম্বা ছিল। তার মধ্যে কি এমন সৌন্দর্য্য আছে? আরে বাবা, কুকুর তো ককুরই।

আমার মনে হয় আমাদের কথা যদি টমি বুঝতে পারতো তাহলে সে-ও সম্মত হত। আমার মনে হয় না সে হারতে অপছন্দ করে। দেখলাম, সে কোত্থেকে যেন একটা ভাঙা ফ্রিসবি পেয়েছে। সেটা পেয়ে সে খুব খুশি। মনে হচ্ছিল যেন সে স্বয়ং ঈশ্বরের দেখা পেয়েছে।

বাস্তবে যা ঘটেছে সেটার কারণে লরা বিষন্ন হয় নি, বিষন্ন হয়েছে সফলতা এবং ব্যর্থতা সম্পর্কে তার ভুল ধারণার কারণে। এই বুদ্ধিটুকু টমির নেই। তাই টমি তার জীবনকে উপভোগ করতে পারছিল। ডগ শোতে গিয়ে কখনো জিতছে, কখনো হারছে, ডগ পার্কে এসে খোড়াখুড়ি করছে – টমির দৃষ্টিতে সবকিছুই সুন্দরভাবে চলছিল।

যাই হোক, লরার ব্যর্থতার চিন্তা এইসব অভিজ্ঞতাকে ম্লান করে দিয়েছে। ভালো হয়েছে যে সে আরেকটি ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পেরেছে। ফাঁদটি হল সফলতা।

লাও জু বলেছেন, “সফলতা ব্যর্থতার মতই ক্ষতিকারক।” এবং যেকোনো লাইফ কোচ [যারা জীবন সম্পর্কে গাইডলাইন দেন] জানেন যে এটা সত্যি। আমি কতবার যে বলতে শুনেছি, “আমি যে চাকরি করছি সেটা আমার ভাল লাগে না। কিন্তু আমি সেটায় দক্ষ। আমি যা করতে চাই সেটা যদি শুরু করি তাহলে আবার শূণ্য থেকে সব শুরু করতে হবে। এবং এটা করতে গিয়ে আমি ব্যর্থও হতে পারি।” [ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে তারা সফল হওয়ার চেষ্টা করছেন না।]

ব্যর্থতার মাঝে বসবাস করলে আমাদের দুঃখ বাড়তে পারে, কিন্তু সফলতার মাঝে বসবাস করলে তাতে আমরা শোকেজে সাজানো পুতুলের মত হয়ে যেতে পারি। জোর করে আঁটকে রাখবো নিজেদের এই চিন্তা করে যে “আমি তো এটাতে দক্ষ।”

এটা একটু অদ্ভুত। কারণ গবেষকগণ রিপোর্ট করেছেন যে তৃপ্তি নির্ভর করে চ্যালেঞ্জের উপর। যত কঠিন চ্যালেঞ্জ জেতা যাবে তত বেশি তৃপ্তি। একটু চিন্তা করুন: যে কম্পিউটার গেমটিতে আপনি সহজেই জিততে পারেন সেটা বোরিং। কিন্তু যেটা আপনি মাঝে সাজে, অনেক কায়দা কসরতের পর জিততে পারেন সেটায় মজা পান।

সেসব গেমসে ঝুঁকি কম থাকে, তাই প্রায় সবাই ব্যর্থ হবার ঝুঁকি নিতে চায়। কিন্তু যখন আমরা আরো সিরিয়াস ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাবতে নিই, যেমন ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি বা সন্তান লালন-পালন করা, তখনই আমরা জেঁকে বসি, নড়তে চাই না এবং ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে চাই না। যাই হোক, এটা তো আর সম্ভব নয়। বাস্তব হলো, আমরা ব্যর্থ হবোই। কিন্তু তারপরও আমরা ব্যর্থতাকে স্বীকার করতে চাই না। আর এভাবে সবকিছুকে আরো জটিল বানিয়ে ফেলি।

সেদিন ট্যামি আমার বাসায় এলো। তাকে অনেক বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। কারণ তার ১৭ বছর বয়স্ক ছেলে জেসন – যাকে সে পারফেক্ট স্নেহ দিয়ে লালন পালন করেছে, মাতৃত্বের সকল নিয়ম পারফেক্টলি মেনে – সেই জেসনকে মদ খাওয়ার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে।

“আমি ব্যর্থ হয়েছি” ট্যামি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আমি জেসনকে ব্যর্থ করেছি; আমি নিজেকে ব্যর্থ করেছি!”
“হুম,” আমি বললাম। “তুমি ঠিকই বলেছো।”

ট্যামি আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি তাকে চড় মেরেছি। আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, “তুমি জীবনে হাজারবার ব্যর্থ হয়েছো, আবার তুমি হাজারবার বিজয়ীও হয়েছো। মাতৃত্বের জগতে স্বাগতম! এটাই তো মায়েদের কাজ। তুমি কি এমন কোনো মা-কে চেনো যে কখনোই তার সন্তানকে ব্যর্থ হতে দেখে নি?”

“অবশ্যই,” ট্যামি মাথা নেড়ে বললো। “কান্ট্রিক্লাবের আমার অনেক বন্ধু আছে যারা পারফেক্ট মা।” সে আরো বেশি কাঁদতে লাগলো। “আর তারা খারাপ মাদেরকে নিয়ে অনেক বাজে কথা বলে। এখন তারা আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলবে, কারণ জেসন...” সে চোখের পানিতে যেন হাবুডুবু খাচ্ছিল।

“বলো তো,” আমি বললাম, “তুমি কি ক্লাবের সেই মহিলাদেরকে পছন্দ করো?”

হঠাৎ তার কান্না থেমে গেল। অনেকক্ষণ সে চুপ করে রইলো। তারপর আমার চোখের সামনেই ট্যামি অন্যরকম হয়ে গেল। সে সোজা হয়ে বসলো।

“একদম না,” সে বললো। “আমি আসলে তাদের কাউকেই পছন্দ করি না।”

“আমি তোমার কথাটা বিশ্বাস করলাম,” আমি ট্যামিকে বললাম। “আমি তোমার বন্ধুদেরকে চিনি না। কিন্তু আমাকে যদি কিছুক্ষণ আগে যেরকম তুমি ছিলে, সেরকম কারো সাথে থাকতে হত, তাহলে আমিও ড্রিংক করা শুরু করতাম।”

“আমি তো সেরকমই,” ট্যামি ঠাট্টার সুরে বললো। “আর ড্রিংক করতে আমার আপত্তি নেই।”

“শোনো শোনো,” আমি বললাম। “এখন তুমি বাড়ি যাও এবং জেসনের কাছে ক্ষমা চাও। সেসব মায়েদেরকে নকল করার জন্য ক্ষমা চাইবে যাদের তুমি পছন্দই করো না। বাস্তবে যা হওয়া সম্ভব তা নিয়ে চিন্তা করো – টিনেজাররা এটাই পছন্দ করে। তুমি যতক্ষণ তাদের সাথে বাস্তবিক আচরণ করবে, ততক্ষণ তুমি মা হিসেবে সফল হতে পারবে। যতই তুমি পারফেক্ট হতে যাবে ততই ব্যর্থ হবে। এবং যখনই তুমি এটা স্বীকার করবে যে তুমি ব্যর্থ, তুমি আবার সফল হবে।”

ট্যামি আমার দিকে আড়চোখে তাকালো। “তুমি কি আমাকে মা হিসেবে ব্যর্থ হতে বলছো?”

“তুমি যখন ব্যর্থ হও,” আমি বললাম “তোমার কি ব্যর্থ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে?”

“না, উপায় থাকে না... কিন্তু ব্যর্থতা স্বীকার করে নেব? মা হিসেবে? আমি পারবো না।”

“অবশ্যই পারবে,” আমি বললাম। “এটা করবে: এটা চিন্তা করো যে তুমি জেসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছো। চিন্তা করে দেখো তো, তুমি কি বিষন্ন হয়ে যাচ্ছো না – এটা ভেবে, যে হায় এ কি হলো?”

ট্যামি মাথা নেড়ে সায় দিল।

“আচ্ছা, এখন উৎফুল্ল হও, আর ‘হায়’ বলার বদলে বলো, ‘যা হওয়ার হয়েছে ...’ ”

আমি ট্যামির দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে মনে করেছিল আমি কিছু বলবো, কিন্তু চুপ করে রইলাম।

ট্যামি হাসলো। “আমি এটা বিশ্বাসই করতে পারছি না” সে বললো। “আমি ভেবেছিলাম তোমার কাছ থেকে উপদেশ নেব যে আমার সন্তানকে কিভাবে ঠিক করা যায়। আর সব শুনে তুমি বললে ‘যা হওয়ার হয়েছে’?”

“যাহ! তাই তো” আমি বললাম। “আমি তোমাকে ব্যর্থ করেছি।” আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম আর রিল্যাক্স করলাম। “যা হওয়ার হয়েছে...”

ট্যামি আমার দিকে আরো একবার তাকিয়ে রইল। সে বললো, “তোমার মুখ থেকে ‘যা হওয়ার হয়েছে’ কথাটা শুনে তোমার প্রতি আমার আস্থা বেড়ে গেল।”

এটা হচ্ছে নিজের ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নেয়ার সুবিধা। আপনি সবকিছু ঠিকঠাকভাবে করার পরও ব্যর্থ হয়েছেন। আপনার এই ব্যর্থতাটুকু খোলাখুলিভাবে, সবার সামনে স্বীকার করে নিলে – একটু অনুশোচনার সাথে – যে আমি চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হই নি – শুধু এতটুকুই আপনার জীবনে একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এতে করে আপনি ক্ষমাশীলতা, বিশ্বাস, সম্মান আর সম্পর্কের এক সীমাহীন ফসল পাবেন। যেগুলো আপনার জিতলে পাওয়ার কথা ছিল, সেগুলোই আপনি হেরে গিয়ে পাচ্ছেন। অদ্ভুত,তাই না?

সম্পর্কের বৈচিত্র

আমি ধন্যবাদ দিই মা হিসেবে আমার ব্যর্থতাকে। আমার ছেলে এ্যাডাম। যদিও আমি কম বয়সে গর্ভধারণ করেছিলাম, তবে কখনো ধূমপান করি নি, মদ ছুয়ে দেখি নি, তারপরও এ্যাডাম একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিয়েছে। সে মানসিকভাবে অস্বাভাবিক। আমি তাকে ভাল ছাত্র, ব্যয়ামবীর, রকেট বিজ্ঞানী বানাতে পারি নি। এত বড় ব্যর্থতাকে কোনকিছু দিয়েই পূরণ করতে পারছিলাম না। মা হিসেবে অনেক ভেঙে পড়েছিলাম।

তখনই আমি শিখেছি, সমস্যা যত বড়, তাতে ব্যর্থতা ততটাই উপকার বয়ে নিয়ে আসে। উপকারটা হচ্ছে: সফলতা থেকে স্বাধীনতা। একজন ভাগ্যবান লোক তার শত্রুর কাছ থেকে পালিয়ে বেঁচে যায়। আর সত্যিকার ভাগ্যবান সে-ই যে (কবি রুমির ভাষায়) ”পালিয়ে একটা বাড়িতে ঢোকে আর অন্যদের জন্য দরজা খুলে দেয়।”

এটা ছোট বা বড় যেকোন আকারে হতে পারে। যেই দিন আমার পেন্সিলপ্রেমী মন ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নিল আর মেকানিকাল কলমটিকে কাগজের উপর নাচতে দিল, সেটা অঙ্কনের একটা নতুন দরজা খুলে দিল।

আমার সন্তানকে আমি “স্বাভাবিক” জীবন দিতে পারি নি এই ধারণাটি আমার অনেক উপকার করেছে। “সফল মায়েদের সন্তানরা বুদ্ধিমান হয়” এবং “আমার বাচ্চারা কখনো হারতে পারবে না” এসব উদ্ভট যুক্তি থেকে আমি মুক্তি পেয়েছি।

আমার সন্তান পারফেক্ট নয় এটা একটু হতাশ হওয়ার মতই কথা। কিন্তু যখন আমি বুঝতে পারলাম, তখন সফলতা আর ব্যর্থতা সম্পর্কে আগে যা জানতাম সবকিছুই অস্পষ্ট হয়ে গেল। নতুন করে ভাবতে শিখলাম। সফলতা আর ব্যর্থতাকে তখন তুচ্ছ মনে হল, যেমনটা আমেরিকান ক্যানেল ক্লাব পারফেক্ট “পুডল”-এর সংজ্ঞা দিয়েছিল। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আনন্দ লুকিয়ে রয়েছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই –এবং অন্য কোনকিছুতে নয়।

আমি দেখছি যে ট্যামি এটা পেয়েছে। জেসনের উচ্ছৃঙ্খলতা ট্যামির জীবনে একটা উপহার হিসেবে এসেছে। যেরকমটা অনেক মাকেই এই উপহার করেছে: কোমল, প্রফুল্ল, শান্ত, উন্নত, সাহসী। কবি এন্টোনিও মাসাডোর ভাষায়:
গতরাতে যখন আমি ঘুমাচ্ছিলাম
স্বপ্নে দেখলাম – আমার ভুলগুলোকে! –
দেখলাম একটা মৌচাক
আমার হৃদয়ে স্থান নিয়েছে।
এবং স্বর্ণালি মৌমাছিগুলো
তৈরি করছিল সাদা মোম
আর মিষ্টি মধু
আমারই করা ভুলগুলো থেকে


আমি এটা বলবো না যে আমি ব্যর্থ হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে ব্যর্থতা আসবেই। তাই আমি স্বস্তি পাই ব্যর্থতা এলে কি করতে হবে সেটা জেনে। আপনার ক্ষেত্রেও এটা কাজ করবে। রিল্যাক্স করুন। নিশ্বাস ছাড়ুন। “হায়”-কে বিদায় দিন, আর “যা হওয়ার হয়েছে”-কে আলিঙ্গন করুন। তারপর যে দরজাই পাবেন তাতে ঢুকে চলতে শুরু করুন।

উপরে নামা

কলেজের শেষের দিকে মেকানিকাল কলম আমার সবচেয়ে প্রিয় আঁকার মাধ্যম হয়ে গিয়েছিল। চেষ্টা এবং ভুল (এবং ভুল, এবং আরো ভুল) করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছিল যে তখন মেকানিকাল কলমকে আমার হাতেরই একটা অংশ হিসেবে মনে হত। আমি বোকা ছিলাম বলে রেইম্যান স্যারের আরেকটা ক্লাসে ভর্তি হলাম। একদিন সকালে যখন আমি আঁকছিলাম, আমার খাতার উপর টুপ করে কি একটা পড়লো। জিনিসটা ছিল জল রঙের ব্রাশ।

“এখন থেকে এটা দিয়ে আঁকবে” স্যার বললেন। “তোমার কাছে এটা অসহ্য লাগবে। তুমি একটা দাগ দিবে, আধঘণ্টা পর দেখবে সেটা অন্যরকম হয়ে গেছে।”

আমি ব্রাশটা হাতে নিলাম। আর বললাম “আপনি তো আমাকে সাহায্য করবেন না, তাই না?”

“দেখ, উত্তরটা এভাবে দেয়া যায়,” রেইম্যান স্যার বললেন “তুমি যত তাড়াতাড়ি তোমার প্রথম ৫০০০ ভুল করবে, তত তাড়াতাড়ি পরের ৫০০০ ভুল করতে পারবে।” এরপর তিনি শয়তানের মত একটা হাসি দিয়ে চলে গেলেন। তিনি আমাকে ব্যর্থতার সাথে আরেকবার নৃত্যের ব্যবস্থা করে দিয়ে চলে গেলেন। তিনি অনুৎসাহী শিল্পীদের উৎসাহিত করেন। তিনি সব শিক্ষকের বড় শিক্ষক।

লিখেছেন: Martha Beck (ডিসেম্বর ২০০৭ সালের “O, The Oprah Magazine”-এ প্রকাশিত: http://www.oprah.com/oprahs-lifeclass/How-to-Turn-a-Failure-Into-Success )
অনুবাদ: আদনান শামীম
( Illustration: Brett Ryder )
Continue reading ...
 

Blogroll

Translate This Blog

Copyright © আদনানের ব্লগ Design by BTDesigner | Blogger Theme by BTDesigner | Powered by Blogger