Thursday, May 7, 2015

গল্প: রাহির গল্প

রাহির গল্প

রাহির সাথে সুমনের দেখা হয় না অনেক দিন। দুপুরগুলো খুব নীরবে কাটে তার। খুব নীরব। মাঝে মাঝে মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই তার সাথে রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। কি অদ্ভুত নিস্তব্ধ শহর -- সে অবাক হয়। রোদটাও কেমন যেন বাজে রকমের একঘেয়ে। ভরা দুপুরের নীরবতাকে কিছুটা হালকা করতে কিছু তৃষ্ণার্ত কাক কোথায় যেন কা-কা করে বেড়ায় মাঝে মধ্যে। কিন্তু সেটা রাহির মনে এতটুকু স্বস্তি দেয় না।

বড় একা রাহি। নীরব দুপুর যেন তার একাকীত্বকে আরো ঘণীভূত করে দেয়। তার মনের দুঃখগুলো এই একাকীত্বের সুযোগে যেন আতশীকাচেঁর মধ্য দিয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। মাঝে মাঝে এই দুঃখগুলোকে ভুলে থাকতে চায় সে। আবার মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দেয়। মাঝে মাঝে হেডফোনে গান শুনে মনকে ভুলিয়ে রাখে।

“কি হয়েছে তোর?” – আগে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন রাহির মা। রাহির মা অতটা শিক্ষিত না। রাহি এখন স্কুল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। রাহির মা তাই তার শিক্ষিত মেয়েকে তেমন একটা ঘাটাতে সাহস পান না। বলে বলে ক্লান্ত হয়ে একসময় তিনি তার নিজের কাজে মন দেন।

রাহি প্রায় একমাস হল ভার্সিটিতে যায় না। কেউ তাকে ফোনও দেয় না -- তার ফোন বন্ধ তাই। কি যেন হয়েছে তার, শুধু বাসায় বসে দিনযাপন করে সে। ঠিকমত খায় না, কথা বলে না। ঘড়ির কাঁটা বা ক্যালেন্ডার – কোনটার হিসেবের দিকেই তার কোন মন নেই।

রাহি শুধু ভাবে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেয়। বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার ভাবে। কি ভুল করেছিল সে? তার সঙ্গে যা হয়েছে তা তো অন্যকারো সাথেও হতে পারতো। তার সাথেই কেন। তারপর কিছুক্ষণ সবকিছু চুপ। একদম নিশ্চুপ। যেন পুরো পৃথিবীটা তার পরবর্তী কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। তারপর পুরো জীবনটা ভেসে উঠে তার মনের কল্পনায়।

রাহির আজ একটু ভাল লাগছে। মাসখানেক পর সে আজ প্রথমবার গোসল করলো। অনেক হালকা লাগছে তার এখন। মনে হচ্ছে শরীরের ময়লার সাথে তার মনের সব দুশ্চিন্তাগুলোও ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। মনটা অনেক ফুরফুরে হয়ে গেছে। এখনই পৃথিবীটাকে জয় করে ফেলতে মন চাইছে তার।

এমনই মুহূর্তে জানালায় হালকা একটা টোকার মত আওয়াজ হল। রাহির চুলে তখনো তোয়ালে জড়ানো। জানালাটা বারান্দার সাথে। সে আলতো পায়ে জানালার কাছে গেল। একটু ইতস্তত করে জানালা দিয়ে তাকালো। নাহ্ বোঝা যাচ্ছে না। তার হালকা ভেজা গায়ে তখনো পসাধনীর ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু তা-ও তার কৌতুহল সইলো না। ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। টোকাটা কিছুই নয়। শহরে এরকম কত শব্দ শোনা যায়। কিন্তু কেন যেন তার মনে হচ্ছে এই টোকাটা অন্যরকম ছিল। সে বারান্দার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে ভাবছিল ঢিলটা যে মেরেছিল সে খুব ঝানু। নাহলে বারান্দা টপকে এই ঢিল... একি!

রাহি যেন অবশ হয়ে গেল। তার স্থির চোখ দুটোতে ভয় আর ঘৃণাভরা এক অভিব্যক্তি। সে অবাক-নির্বিকার। সেই কুৎসিত চেহারাটা... ইস! যাকে সে একমাস ধরে ভোলার চেষ্টা করেছে, সেই ভয় এখন তার সামনে।

কি করবে এখন সে? বুঝতে পারছে না। আকস্মিকতায় সে বসে পড়ে বারান্দায়ই। তার বুক থেকে গলা বেয়ে কান্না আসতে চাইছে। সেটা সে মুখে হাত চেপে সইছে।

কি করবে এখন রাহি? নিশ্চুপ-নির্বিকার সে চুপচাপ বসে রইল। কতক্ষণ কেটে গেছে সে জানে না। কতক্ষণ? এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, দুই ঘণ্টা? জানে না। সবকিছু যেন তার নতুন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর আকাশ, পৃথিবীর বাতাস সবকিছুই নতুন। এই নতুন বাতাসে শ্বাস আঁটকে যাচ্ছে তার। এই পৃথিবীর আকাশ চিড়ে যদি অন্য কোথাও যেতে পারতো সে। যদি নতুন কোন এক গ্রহে বসবাস শুরু করতো সে। শুধু একা, আর কেউ থাকবে না।

“রাহি!” হঠাৎ তার নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে রাহি। পিছনে ফিরে দেখে তার মা। “খেতে আসবি না? খেয়ে নে চল।” রাহি তার মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত পর তার খেয়াল হয় সেই আগন্তুকের। ভীতচোখে সে তাকায় রাস্তার দিকে। কই, কোন মানুষ তো নেই! তাহলে কি কুৎসিত মানুষটা কেবলই তার কল্পনা?

“হুম, আসছি” মার দিকে না তাকিয়েই সে জবাব দেয়। তার মা চলে যায় আর সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যদিও তীব্র অপরাধবোধ তার মন থেকে কাটে না, কিন্তু ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি পায় সে।

নাহ্ সব তার মনের ভুল। নিজেকে আনমনে দোষারোপ করে সে – পাগলী, ও তোমার বাসা চিনবে কি করে? তুমি কি ওকে কখনো বাসায় এনেছ? উহুম, মোটেও না। নিজেকে দোষারোপ করতে করতেই সে উঠে পড়ে খেতে যাবে বলে। নিজেকে সামলে নেয় সে। নিজেকে বোঝায়, কিচ্ছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি। আসলে সব মনের ভুল। সে কখনো... একি! ঢিলটা এলো কোত্থেকে বারান্দায়?

।।।

কতক্ষণ ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে সে। কিন্তু ঘুম আসছে না। শুধু এপাশ আর ওপাশ। চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম আসছে না। ভুলে থাকার চেষ্টা করছে রাহি, কিন্তু বার বার সেই চেহারাটা ভেসে উঠছে মনে। কুৎসিত ভয়ংকর সেই চেহারাটা।

অথচ সেদিনও চেহারাটা কত প্রিয় ছিল। ভার্সিটির সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল সে। তাকে ছাড়া ক্যান্টিনে খাওয়া, আড্ডা -ভাবাই যেত না। সবসময় হাসিমুখটা কেমন এখন কুৎসিত লাগে তার কাছে। ভাগ্যিস সুমনকে সে পেয়েছে ভাবার জন্য। নাহলে সেই কুৎসিত মুখটা তার জীবনকে আরো বিষিয়ে দিতে পারতো।

করিডোরে সেই ঘটনাটা হওয়ার পর থেকেই তাকে এড়িয়ে চলে রাহি। সে তাকে কতবার বলেছে, “দ্যাখ, তুই এগুলো করিস না। লোকে আমাকে খারাপ ভাববে।” মারুফ কিন্তু নাছোরবান্দা, সে বলে “লোকে মাইন্ড করলে আমার কি? আমি তো তোর ফ্রেন্ড।” রাহি কিছু বলতে পারে না। বলতে পারে না যে হঠাৎ হঠাৎ তার হাত ধরাটা রাহির সহ্য হয় না রাহির। সুমন দেখে ফেললে কি হবে! – সে তো রাতে ঘুমাতেই পারবে না। ও একটু সেনসিটিভ কিনা! তবে ছেলে খুব ভাল।

দুই বছর যাবত রাহি-সুমনের প্রেম চলছে, অথচ মারুফরা কিছুই জানে না। লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে তারা দু দু’টি বছর। রাহি খুব ভালোবাসে সুমনকে, কিন্তু সুমন তা জানে না। সুমন জানে সে ভেবে দেখছে!

রাহি মাঝে মাঝে ভাবে, মানুষ এত ভাল হয় কি করে? সুমনকে সে যা-তা বলে, অথচ সে বেহায়ার মত আবার তার কাছে আসে। সে কোন দোষ না করলেও রাহির কাছে সে উল্টো ক্ষমা চায়। মনে মনে হাসে রাহি, “বোকা ছেলে!”

তবে এই বোকা ছেলেটাকেই মন দিয়ে ফেলেছে সে! কেন যেন তাকে দেখলে আর কাউকে ভাল লাগে না, আর কাউকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে না। সুমনকে ভেবে ভেবে সে বোধহয় দিন পার করে দিতে পারবে কিন্তু ওর ভাবনা ফুরোবে না!

এই ভালোবাসার গল্পে মারুফ এসেছে কাবাবে হাড্ডির মত। ওকে যে কিভাবে বোঝাবে সে। বন্ধু মানুষ, কিছু বলতেও পারে না। তবে ওর সাহচর্য ভাল লাগে তার। ও খুব ফানি তো! ওকে ছাড়া আড্ডাই জমে না। কিন্তু মারুফ যে এমন একটা জঘণ্য কাজ করবে সেটা সে ভাবতেও পারে নি। না না। মনকে বোঝায় সে, “কিচ্ছু হয় নি। সব কল্পনা। সবকিছু ঠিক আছে।”

কিন্তু মন তো বাধা মানে না। মারুফকে নিয়ে এখনও তার চিন্তা শেষ হয়নি। কেন এমন করলো মারুফ? ওকে তো সে বিশ্বাস করেছিল।

নাহ্, আর ভাল লাগছে না। সে উঠে চলে গেল বারান্দায়। আজকের জোৎন্সাটা না অসাধারণ! মনে মনে সে কল্পনা করে, সুমন এসে তার হাতটা ধরলো। সুমন তার দিকে হাসিমুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। খুব ভাল লাগছে রাহির। ঠিক তখনই একটা হালকা বাতাসের ছোঁয়া এসে তাকে স্বর্গীয় আনন্দ দিয়ে গেল।

।।।

সকালে রাহির ঘুম ভাঙে তার মার ডাকে। “রাহি! রাহি! এই রাহি ওঠ তো। দ্যাখ কে এসেছে তোর সাথে দেখা করতে!”

রাহি বিরক্ত। “কে?”

“আরে ওঠ তো।”

“কে আসবে আমার সাথে দেখা করতে?” বলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করে সে।

“আরে তোর ভার্সিটি থেকে একটা ছেলে এসেছে।” একথা শুনে সে ঝট করে উঠে পড়লো। মনে মনে ভাবলো, সুমন না তো? এবার আর সে ভুল করবে না। ক্ষমা চেয়ে নিবে সে। মারুফ যা করেছে তা সবকিছু বলে দেবে। প্রয়োজন হলে পা ধরে ক্ষমা চাইবে সে।

উত্তেজনায় তার গলা ধরে আসছে। কোন রকমে বলল, “কোথায়?”

“ড্রইংরুমে বসে আছে। সে কে হয় রে তোর? চিনিস তো?” তার মা-ও বুঝতে পারছে না কি ব্যাপার স্যাপার।

রাহি যেন তার মার কথাটা শুনতেই পায় নি। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। সুমন এতদিন পর এসেছে, আর সে এভাবে দেখা করবে। পাগলীর মত দেখাচ্ছে তাকে। আয়নায় তার নিজের চেহারা দেখে লজ্জা পায় সে। কিন্তু সেটা মা-কে বুঝতে দেয় না।

সে বুঝতে পারছে না এখন সে কি করবে। মেকাপ করবে? হাতমুখ ধুবে? কাপড় কি চেঞ্জ করবে? তাকে সুন্দর দেখা গেলে হয়তো সুমন তাকে ক্ষমা করে দেবে। সে যখন এসব ভাবছিল ঠিক তখনই হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন একটা ফেরেশতা বলে উঠলো, “রাহি, অনেস্ট হ। যেভাবে আছিস সেভাবে যা। ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ক্ষমা নিস না।” অনেক ভেবে চিন্তে সে কেবল হাত মুখ ধুয়ে, চুলটা আছড়ে নিল। রাহি যখন চুল আছড়াচ্ছিল, তখন আয়নার ওপারের রাহির সাথে তার চোখাচোখি হচ্ছিল। সেই মনের ফেরেশতা তখন বলল, “তুই নষ্টা। তুই নষ্ট হয়ে গেছিস। ও তোকে জীবনেও ক্ষমা করবে না। ...তুই অনেক ছোট হয়ে গেলি রে!” কথাগুলো শুনে তার একটু ভয় হচ্ছিল। সে যদি তাকে ক্ষমা না করে? সুমনকে ছাড়া সে বাঁচবে কি করে?

রাহি মাকে বলল, “মা, তুমিও চলো আমার সাথে।” আবার কি একটা ভেবে বলল, “থাক তুমি ভেতরে চলে যাও, আমি না ডাকলে এসো না।”

সে একাই ড্রইংরুমের দিকে হাঁটা দিল। হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবছে, কিভাবে কথাগুলো বলবে। সে পারবে – মনে মনে ভাবছে সে। কলেজজীবনে বাণিজ্য মেলায় সেলস গার্লের কাজ করেছিল সে, এয়ার কন্ডিশনের। আঠারোটা সেল করেছিল সে! সবাইকে টেক্কা দিয়েছিল তার সেলের পরিমাণ। সে কথায় না পারলে, আর কে পারবে? মনের ফেরেশতা আবার বলল, “কথা দিয়েই কি সব হয়? তুই তো নষ্টা। তোর কথায় কেউ বিশ্বাস করবে না।... ক্ষমা পাবি না... ক্ষমা পাবি না... নষ্টা মেয়ে।” এখন তার মনে পড়লো, কি নিষ্ঠুর আচরণ করত সে সুমনের সাথে। সুমনের সাথে রাগ করে সে কথা বলতো না, সে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করতো না। কি নিষ্ঠুর এক নির্দয় মেয়ে ছিল সে। তার আরো ভাল মেয়ে পাওনা ছিল। রাহির চেয়ে মারিয়াকে সুমনের সাথে বেশি মানাতো। মারিয়া নামে একটা মেয়ে পড়ে ওর ক্লাসে। মেয়েটা অনেক ভদ্র। ওকে খুব পছন্দ হত সুমনের...

এসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে সে একসময় ড্রইংরুমের পর্দার সামনে চলে এলো। পর্দার ওপারেই সুমন তার জন্য অপেক্ষা করছে। একটা বড় শ্বাস নিল, তারপর নিশ্বাস ছাড়লো। আর সইলো না, পর্দা সরিয়ে ফেলল সে। সরিয়ে ও যা দেখলো তাতে সে নিজেকে আর বিশ্বাস করতে পারল না। ওর জন্য সে এত প্রস্তুতি নিল, এই দানবটার জন্য? একটু ধাতস্ত হতেই ভাবলো এই হায়েনাটা আমার ঠিকানা পেল কি করে? সেকি মাকে সব বলে দিল নাতো? নষ্টা মেয়ের গল্পটা কি সবার জানা হয়ে গেল তাহলে? নিজের অজান্তেই সে বসে পড়লো কাছের একটা সোফায়।

“কেন এসেছিস?” চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল সে। “তোকে আমি চিনি না। তুই চলে যা।”

“কেন? কথা বলবি না?” মারুফের নির্লিপ্ত উত্তর।

রাহির মুখ ঘৃণায় ভরে উঠলো, “তোকে আমি পুলিশে দিব।”

“রাহি, দোস্ত, একটা কথা শোন। দ্যাখ, তুই আমাকে ভুল বুঝছিস।”

রাহি দাড়িয়ে গেল, “তুই বেরিয়ে যা।” চোখগুলো তার মাতালের মত লাল হয়ে গেছে। “আর জীবনে কখনো আমার সাথে কথা বলবি না।”

রাহি ভেতরে চলে যাচ্ছিল। তখনই মারুফ বলল, “রাহি, আমরা ফান করেছিলাম। সেদিন আসলে কিছুই হয় নি।”

“কি?” রাহি অবাক।

“তুই যেদিন আমাদের সাথে বেরিয়েছিলি সেদিন ঘুরতে ঘুরতে তুই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলি। তুই জ্ঞান হারানোর পর আমি আমার ডাক্তার বন্ধুকে ফোন দিয়ে সিম্পটম বললাম। সে বলল চিন্তার কোন কারণ নেই, কাছাকাছি কোন হাসপাতালে নিয়ে গেলেই হবে। আমি তখন দেখলাম যে তোর অবস্থা বেগতিক, হাসপাতালে নিতে গেলে সময় লাগবে। তখন আমার বন্ধু একটা ইঞ্জেকশনের নাম বলল। সেটা কাছের একটা ফার্মেসি থেকে নিয়ে এসে পুশ করে দিলাম।”

মারুফ একটু থেমে লক্ষ্য করল রাহির অবস্থা। রাহি একটু একটু করে শান্ত হচ্ছে। “তুই তো জানিস আমি কেমন। ভাবলাম এই তো সুযোগ। তুই ওঠার পর কাহিনী বানালাম যে আমি ড্রাগ ডিলার। ভার্সিটির সব সুন্দরীদের কাছে আমি ড্রাগস বিক্রি করি। সুন্দরী হওয়ার জন্য এই ড্রাগস সবাই নেয়। ভার্সিটিতে এটা খুব জনপ্রিয়। ... আমি তোকে এই ড্রাগ পুশ করে এডিকটেড বানিয়ে দিয়েছি। ... আরে আরে!”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সোফার বালিশ দিয়ে মারুফকে মারা শুরু করে দিল রাহি।

“তুইও বোকা, এসব গালগপ্পো বিশ্বাস করে আনারের মত সুন্দর চেহারাটাকে পেয়ারার মত বানিয়ে রেখেছিস! সুন্দর হওয়ার জন্য আবার ড্রাগস! হাহাহা!” মারুফের মুখে শয়তানের হাসি।

“তুই জানিস, আমি কি অবস্থার মধ্যে কাটিয়েছি। আমি তো আত্মহত্যাও করতে পারতাম, ঠিক না?” এখনও রাগ আছে রাহির।

“আমি তোর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তোর ফোন বন্ধ পেয়েছি। এতদিন ফোন বন্ধ, ভার্সিটিও যাস না – এসব দেখে খোঁজ নিলাম তোর বান্ধবীদের কাছ থেকে। তারপর নিজেই সেদিন চলে এসেছিলাম তোর বাসায়।”

রাহির রাগ তখনও থামে নি। মারুফ বলছেই, “সেদিন জানিস, আমি তোকে খুব ভয় পেয়েছিলাম রে! ভয়ে তোর দরজা পর্যন্ত আসতে পারি নাই। তাই জানালায় ঢিল ছুড়েছিলাম। তুই আসলি না। ... থাকতে না পেরে আজ বাসায় চলে এলাম। স্যরি, মাফ করে দে।”

“এতদিন পর এসেছিস ক্ষমা চাইতে? আমি তোকে কক্ষনো...”

“আমি জানি আমি ভুল করেছি। কিন্তু আমি এত বোকা না। আমি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। দরজার বাইরেই ওকে দাড় করিয়ে রেখেছি!”

ও বুঝতে পারছে না, ওর কান কি ধোকা দিল? সে বলতে কে? মারুফ কি তাহলে আগে থেকেই জানতো? সব চিন্তা বাদ। সে আজ সবকিছু উসুল করে নিবে, এতদিন সে কোথায় ছিল? দেখি হতচ্ছাড়াটা কোথায়। দরজা খুলে সে দেখে রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে আছে সুমন।

রাহির রাগ কোথায় যেন উবে গেল। রাহি কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে আবিষ্কার করলো সুমনের আলিঙ্গনে। রাহি জানে না কতক্ষণ কেটেছে। রাহি শুধু অনুভব করছে। রাহি তার কানের কাছে গিয়ে বলল, “ভালোবাসি।”

সুমন মনে মনে অনেক খুশি হয়েছে, কিন্তু সেটা লুকাতে চাইলো। “এতদিন লাগলো?”

সে এখন অনুভবে ব্যস্ত। এতকিছু বলার সময় নেই তার, “স্যরি।” মিনিটখানেক পর বলল, “প্রমিস। আর কক্ষনো এমন করবো না।”

“এখন থেকে কিন্তু প্রতিদিন বলতে হবে।”

“আচ্ছা।”, সম্মতির সুর রাহির গলায়।

সুমন জিজ্ঞেস করে, “কোনটা বলবে বুঝেছ?”

“স্যরি।”

____________________________________
( লিখেছেন আদনান শামীম )

1 comments:

bubbleclassic said...

I love stories, it's good to look at movies, but it's much better to read and imagine. geometrydash.club

 

Blogroll

Translate This Blog

Copyright © আদনানের ব্লগ Design by BTDesigner | Blogger Theme by BTDesigner | Powered by Blogger